
ক্রাইম রিপোর্টার:-রাজশাহীর চারঘাট উপজেলায় একটি সংগঠিত কিশোরগ্যাংকে কেন্দ্র করে মাদক, চাঁদাবাজি, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়ভাবে ‘সজিব বাহিনী’ নামে পরিচিত এই চক্রটির নেতৃত্বে রয়েছেন সজিব হাসান (২৪)। এলাকাবাসীর দাবি, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ও আর্থিক প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে তিনি দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় একটি অপ্রকাশ্য আধিপত্য বিস্তার করে আসছেন।স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, উপজেলার পাটিকান্দি গ্রামের বাসিন্দা সজিব হাসান প্রায় ১৮ থেকে ২০ জন সদস্য নিয়ে একটি কিশোরগ্যাং গড়ে তোলেন, যারা বিভিন্ন সময় চাঁদাবাজি, হুমকি প্রদান এবং অবৈধ কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে অভিযুক্ত। অভিযোগ রয়েছে, তিনি সরদহ ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সাবেক নেতা এবং বর্তমানে উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত। একই সঙ্গে স্থানীয় রাজনীতির প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ঘনিষ্ঠজন হিসেবেও পরিচিত ছিলেন তিনি।সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বহু প্রভাবশালী ব্যক্তি এলাকা ছেড়ে গেলেও সজিব ও তার অনুসারীরা এখনো সক্রিয়—এমনটাই দাবি স্থানীয়দের। তাদের অভিযোগ, এই চক্রটি প্রকাশ্যে এলাকায় দাপট দেখিয়ে বেড়াচ্ছে, ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের স্থায়ী ভীতির পরিবেশ তৈরি হয়েছে।অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, অল্প সময়ের ব্যবধানে সজিব হাসান বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। স্থানীয়দের মতে, গত দুই থেকে তিন বছরে তিনি একাধিক ২৬ চাকার লড়ি ট্রাকের মালিক হয়েছেন এবং বিভিন্ন ব্যাংকে তার নামে কোটি টাকার লেনদেন রয়েছে। ইতোমধ্যে চারটি ট্রাকের নম্বর পাওয়া গেছে—ঢাকা মেট্রো ঢ ৮১-০০১৮, ৮৪-০৪৯৮, ৮৪-০৫০১ ও ৮১-০৪৬২। এত কম বয়সে তার এই সম্পদের উৎস নিয়ে এলাকায় নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে।অভিযোগ রয়েছে, ট্রাক ব্যবসার আড়ালেই চলছে মাদক ও অবৈধ অস্ত্র পরিবহন। স্থানীয়দের একটি অংশের দাবি, চাঁপাইনবাবগঞ্জের সোনামসজিদ এলাকা থেকে পাথর বোঝাই ট্রাকের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন জেলায় এসব অবৈধ পণ্য সরবরাহ করা হয়। একাধিক সূত্র বলছে, ট্রাকগুলো বিভিন্ন জেলায় দীর্ঘ সময় অবস্থান করার পর গন্তব্যে পৌঁছায়, যা সন্দেহের জন্ম দিয়েছে।নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সাবেক ট্রাকচালক জানান, তিনি কয়েক মাস সজিবের ট্রাক চালিয়েছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, পাথর বহনের আড়ালে অন্য কিছু পরিবহন করা হতো বলে তার সন্দেহ হয়েছে। বিষয়টি বুঝতে পেরে তিনি কাজ ছেড়ে দেন।অন্যদিকে, আর্থিক প্রতারণার অভিযোগও সামনে এসেছে। জোর্তকাত্তিক বিএন উচ্চ বিদ্যালয়ের কম্পিউটার শিক্ষক সেকেন্দার আলী অভিযোগ করেন, ট্রাক ব্যবসায় অংশীদার করার প্রলোভন দেখিয়ে তার কাছ থেকে ৩৮ লাখ টাকা নেওয়া হয়। পরে টাকা ফেরত চাইলে তাকে ভয়ভীতি দেখানো হয় এবং তার দেওয়া চেক ব্যবহার করে উল্টো তার বিরুদ্ধেই মামলা দায়ের করা হয়। বর্তমানে তিনি নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন বলে জানান।চাঁদাবাজির অভিযোগও ক্রমেই বাড়ছে। পাটিকান্দি বাজারের একাধিক ব্যবসায়ী অভিযোগ করেছেন, জমি কেনার পর তাদের কাছে চাঁদা দাবি করা হয়। চাঁদা না দিলে বাজারে ব্যবসা করতে বাধা দেওয়া ও মিথ্যা মামলায় জড়ানোর হুমকি দেওয়া হয় বলে দাবি তাদের। একই ধরনের অভিযোগ করেছেন ভুষিমাল ব্যবসায়ী জিয়াউর রহমান এবং স্থানীয় বাসিন্দা সুবোধ কুমার। সুবোধ কুমার জানান, সংখ্যালঘু হওয়ায় তিনি নিজেকে আরও বেশি ঝুঁকির মধ্যে মনে করছেন।এলাকার সচেতন মহল বলছে, অভিযোগগুলো যদি সত্য হয়, তবে এটি শুধু একটি অপরাধচক্র নয়, বরং একটি সংগঠিত অপরাধ নেটওয়ার্কের ইঙ্গিত বহন করে, যা দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনের নজরের বাইরে থেকে গেছে।অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সজিব হাসান বলেন, তিনি চারটি ট্রাকের মালিক এবং বৈধ ব্যবসার মাধ্যমেই আয় করছেন। চাঁদাবাজি বা অবৈধ কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ তিনি অস্বীকার করেন। তবে তার সম্পদের উৎস সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চাইলে তিনি ফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন এবং পরবর্তীতে আর যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।এ বিষয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চারঘাট উপজেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক আবুল কালাম আজাদ বলেন, কিশোরগ্যাং, মাদক ও চাঁদাবাজির মতো অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর। এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া জরুরি, অন্যথায় আইনের শাসন হুমকির মুখে পড়তে পারে।চারঘাট মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল মালেক বলেন, তিনি নতুন দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন এবং তার সময়কালে এলাকায় কোনো ধরনের সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি বা মাদক ব্যবসা বরদাশত করা হবে না। অভিযোগ পেলে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি জানান।এদিকে স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত একটি নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করে দোষীদের আইনের আওতায় আনা হোক। অন্যথায় চারঘাটের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরও অবনতির আশঙ্কা রয়েছে বলে মনে করছেন তারা।
প্রকাশক ও সম্পাদক: মোহাঃ সোহানুল হক পারভেজ নির্বাহী সম্পাদক: টিপু সুলতান, বার্তা সম্পাদক: হাফিজুল ইসলাম, রাজশাহী অফিস: রাণীবাজার, অলোকার মোড়, ঘোড়ামারা, বোয়ালিয়া, রাজশাহী। মোবাইলঃ ০১৭৬১-৮৯৯১১৯, ০১৭৬২-৬৯৬২৭০ ই-মেইল: jonotarsomoy24@gmail.com
Copyright © 2024 জনতার সময় 24. All rights reserved.