
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:ঐতিহাসিক প্যারিস চুক্তিতে নির্ধারিত বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস সীমা বিশ্ব খুব দ্রুতই অতিক্রম করতে যাচ্ছে-এমন চরম বাস্তবতাকে সামনে রেখে একটি ঐতিহাসিক মূল্যায়ন প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে জাতিসংঘ। প্রতিবেদনে উষ্ণতার এই বিপজ্জনক সীমা সাময়িকভাবে ছাড়িয়ে যাওয়ার পর তা পুনরায় কীভাবে নিচে নামিয়ে আনা সম্ভব, সে বিষয়ে রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে। তবে জাতিসংঘের কোনো সংস্থার পক্ষ থেকে প্রথমবারের মতো এমন প্রকাশ্য মূল্যায়ন প্রকাশের পর জলবায়ু বিজ্ঞানী ও আন্দোলনকর্মীদের তীব্র অসন্তোষ ও সমালোচনার মুখে পড়েছে সংস্থাটি।বিজ্ঞানী মহলের ঐকমত্য রয়েছে যে, শিল্পবিপ্লব-পূর্ব সময়ের তুলনায় বৈশ্বিক উষ্ণতা ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করলে পৃথিবীজুড়ে নজিরবিহীন বিপর্যয় দেখা দেবে। এই ঝুঁকি এড়াতে ২০১৫ সালে প্রায় দুই শতাধিক দেশ বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধিকে নিরাপদ সীমার মধ্যে বেঁধে রাখার অঙ্গীকার করেছিল। তবে বর্তমানে বিশ্ব পরিস্থিতি সে অবস্থান থেকে অনেকটাই দূরে সরে গেছে। জীবাশ্ম জ্বালানির অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের ফলে ইতোমধ্যে প্রাক-শিল্পযুগের তুলনায় তাপমাত্রা প্রায় ১.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি পেয়েছে এবং মানব ইতিহাসের নথিবদ্ধ রেকর্ডে গত তিন বছর ছিল উষ্ণতম। বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই পৃথিবী বিপজ্জনকভাবে ১.৫ ডিগ্রির প্রান্তসীমা অতিক্রম করবে।প্যারিস থেকে বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচি (ইউএনইপি) তাদের বহুল প্রত্যাশিত প্রতিবেদনে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়েছে যে ১.৫ ডিগ্রির সীমা অতিক্রম করা এখন প্রায় অনিবার্য। ফলে এখনকার মূল চ্যালেঞ্জ শুধু সীমা অতিক্রম ঠেকানো নয়, বরং তথাকথিত 'ওভারশুট' বা সীমা অতিক্রমের সময়কালকে যতটা সম্ভব সংক্ষিপ্ত ও সীমিত রাখার দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করা।প্রতিবেদনের সহ-লেখক এবং যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব এক্সেটারের খ্যাতনামা বিজ্ঞানী রিচার্ড বেটস বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়ার আহ্বান জানিয়ে উল্লেখ করেছেন, বিশ্ববাসীকে এখন এই উষ্ণতর বাস্তবতার সঙ্গে বসবাসের প্রস্তুতি নিতে হবে, যদিও সর্বোচ্চ বিপর্যয় এড়াতে এখনো দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। আরেক সহ-লেখক ডেব্রা রবার্টস সতর্ক করে বলেন, নীতিনির্ধারকদের দ্রুত অনুধাবন করতে হবে যে সংকট মোকাবিলার নিয়ম বদলে যাচ্ছে। তিনি আরও জানান, বর্তমান বৈশ্বিক কোনো পরিকল্পনাই এমন ভয়াবহ পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য পর্যাপ্ত নয়, তাই বিদ্যমান জলবায়ু শাসনব্যবস্থাকে অবিলম্বে পুনর্গঠন করা জরুরি।এদিকে জাতিসংঘের এই নতুন অবস্থানকে জলবায়ু সুরক্ষার আন্দোলন থেকে পিছিয়ে আসার শামিল বলে মনে করছেন পরিবেশ আন্দোলনকর্মীরা। গ্রিনপিস ইন্টারন্যাশনালের উপ-কর্মসূচি পরিচালক জ্যাসপার ইনভেন্টর ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, ওভারশুটের বাস্তবতা কখনো ১.৫ ডিগ্রির লড়াই ছেড়ে দেওয়া কিংবা আত্মসমর্পণের অজুহাত হতে পারে না। পাশাপাশি বিশিষ্ট জলবায়ুবিজ্ঞানী ও ক্লাইমেট অ্যানালিটিকসের প্রধান নির্বাহী বিল হেয়ার কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, জাতিসংঘের এই সুর জলবায়ু রক্ষার জোরদার পদক্ষেপের বিপরীতে বৈশ্বিক উদাসীনতাকে উৎসাহিত করার ঝুঁকি তৈরি করছে। বিশেষ করে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির মুখোমুখি থাকা ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্রগুলো এই লক্ষ্য পরিত্যাগের তীব্র বিরোধিতা করছে।উষ্ণতা ১.৫ ডিগ্রি ছাড়ালে মেরু অঞ্চলের বরফের স্তর আকস্মিক ধসে পড়া কিংবা সামুদ্রিক প্রবালপ্রাচীর চিরতরে বিলীন হওয়ার মতো অপূরণীয় 'টিপিং পয়েন্ট'-এ পৃথিবী পৌঁছানোর আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে ইউএনইপির নির্বাহী পরিচালক ইঙ্গার অ্যান্ডারসেন স্পষ্ট করেছেন যে ১.৫ ডিগ্রির লক্ষ্য বাতিল করা হয়নি, বরং কৌশল পরিবর্তন করে এখন অতিরিক্ত তাপমাত্রা ওপর থেকে নিচে নামিয়ে আনার দিকে এগোতে হবে। জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসও আশ্বস্ত করে জানিয়েছেন, চলতি শতাব্দীর শেষ নাগাদ তাপমাত্রা আবার নিরাপদ সীমায় নামিয়ে আনা সম্ভব এবং এই লড়াই মূলত মানবজাতি রক্ষারই লড়াই।ইউএনইপির প্রতিবেদনে লক্ষ্য অর্জনের জন্য গ্রিনহাউস গ্যাসের নির্গমন তাৎক্ষণিকভাবে কমানোর পাশাপাশি বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন অপসারণ ও ভূগর্ভস্থ সংরক্ষণের মতো প্রযুক্তির ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। তবে পরিবেশবাদী সংস্থাগুলোর মতে, এখনও পরীক্ষামূলক পর্যায়ে থাকা ব্যয়বহুল ও অনিশ্চিত কার্বন অপসারণ প্রযুক্তির ওপর নির্ভর না করে কয়লা, তেল ও গ্যাসের মতো জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার অবিলম্বে বন্ধ করাই বিপর্যয় ঠেকানোর একমাত্র কার্যকর পথ।
প্রকাশক ও সম্পাদক: মোহাঃ সোহানুল হক পারভেজ নির্বাহী সম্পাদক: টিপু সুলতান, বার্তা সম্পাদক: হাফিজুল ইসলাম, রাজশাহী অফিস: রাণীবাজার, অলোকার মোড়, ঘোড়ামারা, বোয়ালিয়া, রাজশাহী। মোবাইলঃ ০১৭৬১-৮৯৯১১৯, ০১৭৬২-৬৯৬২৭০ ই-মেইল: jonotarsomoy24@gmail.com
Copyright © 2024 জনতার সময় 24. All rights reserved.