টি আই এস বিউটি:দেশের বর্তমান রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতিকে ‘অত্যন্ত অস্থিতিশীল ও অনিশ্চিত’ বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের। তিনি বলেন, রাজনৈতিক মেরুকরণ, অর্থনৈতিক দুরবস্থা, উগ্রবাদী প্রবণতা ও সামাজিক বিভাজন একসঙ্গে দেশকে বড় ধরনের সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। বিদ্যমান পরিস্থিতির পরিবর্তন না হলে ভবিষ্যতে গৃহসংঘাত, অর্থনৈতিক মন্দা এমনকি দুর্ভিক্ষসদৃশ পরিস্থিতিও সৃষ্টি হতে পারে।
একান্ত সাক্ষাৎকারে জিএম কাদের সকালের সময়’কে বলেন, দেশে রাজনৈতিক স্বাভাবিকতা নেই, সামাজিক নিরাপত্তাবোধ দুর্বল হয়ে পড়েছে এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্থবির হয়ে যাচ্ছে। বিনিয়োগ কমে যাওয়া, শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়া, বেকারত্ব বৃদ্ধি এবং মূল্যস্ফীতির চাপে সাধারণ মানুষের জীবন আরও কঠিন হয়ে উঠছে।
তিনি বলেন, “রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ছাড়া অর্থনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতা সম্ভব নয়। কিন্তু বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বিভিন্ন কারণে বিঘ্নিত হয়েছে।”
‘উগ্রবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার উত্থান’
দেশের একটি অংশ মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে অস্বীকার করে নতুন রাজনৈতিক বয়ান প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে বলে দাবি করেন জিএম কাদের। তার ভাষ্য, এই গোষ্ঠীর একটি অংশ ২০২৪ সালের আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছে এবং এখন রাষ্ট্রক্ষমতা ও রাজনৈতিক প্রভাবের সুফল ভোগ করতে চায়।
তিনি বলেন, “তারা একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকে ভুল সিদ্ধান্ত হিসেবে তুলে ধরছে এবং ২০২৪ সালের আন্দোলনকেই প্রকৃত স্বাধীনতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে।” এ ধরনের প্রবণতা সমাজে নতুন বিভাজন তৈরি করছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। একই সঙ্গে সাম্প্রদায়িক ও উগ্রবাদী গোষ্ঠীর তৎপরতা বৃদ্ধি ভবিষ্যতে সংঘাতের ঝুঁকি বাড়াতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
‘মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মানুষের ওপর চাপ’
মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও স্বাধীনতার পক্ষের রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাসী মানুষের ওপর সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ বাড়ছে বলে দাবি করেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান।
তিনি বলেন, “অনেক ক্ষেত্রে মানুষ স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারছে না। রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে হয়রানি, হামলা, মামলা এবং সামাজিক বঞ্চনার অভিযোগ উঠছে।” এসব পরিস্থিতি দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক সংঘাতের জন্ম দিতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
‘অর্থনীতি দুর্বল, মানুষের কষ্ট বাড়ছে’
দেশের অর্থনীতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে জিএম কাদের বলেন, কর্মসংস্থান সংকুচিত হচ্ছে, নতুন বিনিয়োগ আসছে না এবং শিল্প উৎপাদন কমে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি ও কৃষি উৎপাদন ব্যয় আরও বাড়তে পারে বলেও তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
তার মতে, “আয় বাড়ছে না, কিন্তু জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ছে। এতে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের ওপর চাপ আরও বাড়ছে।”
‘নির্বাচন অবাধ ও সমতাপূর্ণ হয়নি’
সাম্প্রতিক নির্বাচন প্রসঙ্গে জিএম কাদের বলেন, নির্বাচনে সব রাজনৈতিক শক্তির অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয়নি এবং প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশও ছিল না।
তিনি দাবি করেন, “সব পক্ষ সমান সুযোগ পায়নি। নির্বাচন নিয়ে জনমনে প্রশ্ন রয়েছে। ফলে নির্বাচন-পরবর্তী সময়েও রাজনৈতিক অস্থিরতা কাটেনি।”
‘আওয়ামী লীগের ওপর যা হচ্ছে, সমর্থন করি না’
আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম সীমিত করা, নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে অভিযান এবং দলটির ওপর চলমান চাপের সমালোচনা করে জিএম কাদের বলেন, আইনের শাসনের বাইরে কোনো রাজনৈতিক দলের অধিকার হরণ সমর্থনযোগ্য নয়।
তিনি বলেন, “মামলা থাকলে বিচার হবে। কিন্তু বিচারের নামে প্রহসন, রাজনৈতিক অধিকার হরণ কিংবা মব ভায়োলেন্স গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।” বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অবদানের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, দেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ইতিহাসে আওয়ামী লীগের ভূমিকা অস্বীকার করা যায় না।
‘রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করে স্থিতিশীলতা আসবে না’
কোন দলের রাজনৈতিক কার্যক্রম সীমিত বা নিষিদ্ধ করার বিষয়ে জিএম কাদের বলেন, কোনো বড় রাজনৈতিক শক্তিকে রাজনীতির বাইরে রেখে দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।
তার ভাষায়, “দেশের অন্যতম রাজনৈতিক দলকে বাদ দিয়ে রাজনৈতিক সমাধান হবে না। এতে মুখোমুখি অবস্থান আরও তীব্র হতে পারে।”
‘বিএনপি শত্রু চেনায় ভুল করছে’
রাজনৈতিক সমীকরণ নিয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে জিএম কাদের বলেন, বিএনপি বর্তমানে তাদের প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ও আদর্শগত চ্যালেঞ্জকে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে পারছে না।
তিনি বলেন, “আমার ব্যক্তিগত মত হলো বিএনপি শত্রু চেনায় ভুল করছে। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বিরোধের কারণে তারা আওয়ামী লীগকে প্রধান শত্রু মনে করছে। কিন্তু ভবিষ্যতে রাজনৈতিক বাস্তবতা তাদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করতে পারে।”
‘আওয়ামী লীগকে নিশ্চিহ্ন করা সম্ভব নয়’
আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্নের জবাবে জিএম কাদের বলেন, দলটির সাংগঠনিক ভিত্তি ও সামাজিক শিকড় এত গভীর যে প্রশাসনিক বা রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে দলটিকে রাজনীতি থেকে মুছে ফেলা সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, “প্রজন্ম ধরে যারা আওয়ামী লীগের রাজনীতি করে এসেছে, সেই রাজনৈতিক শক্তিকে নিষ্ক্রিয় করে রাখা দীর্ঘমেয়াদে সম্ভব নয়।”
‘জাতীয় পার্টি সবসময় মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে’
সাক্ষাৎকারের শেষাংশে জিএম কাদের বলেন, জাতীয় পার্টি সবসময় মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি হিসেবে অবস্থান নিয়েছে এবং ভবিষ্যতেও সেই অবস্থান বজায় রাখবে।
তিনি বলেন, “মুক্তিযুদ্ধ ছিল অনিবার্য। পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যা ও দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে লড়াই ছাড়া তখন বাঙালির সামনে অন্য কোনো পথ ছিল না। আমরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, আইনের শাসন এবং রাজনৈতিক সহনশীলতার পক্ষে আছি।”
জাতীয় পার্টির ওপর অতীতে হামলা ও বাধার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি দাবি করেন, দলটি কখনো সহিংস রাজনীতিতে বিশ্বাস করেনি এবং ভবিষ্যতেও জনগণের স্বার্থ ও গণতান্ত্রিক রাজনীতির পক্ষে অবস্থান অব্যাহত রাখবে।