স্টাফ রিপোর্টার:রাজশাহীর তানোরে ধান কাটা প্রায় শেষের দিকে। পুরোদমে চলছে মাড়াইয়ের কাজ। মাড়াইয়ের পাশাপাশি খড় শুকাতে ব্যস্ত সময় পার করছেন বোরো চাষিরা। বোরো ধানে ফলন ভালো হলেও স্বস্তি নেই কৃষকদের মনে। ধান ঘরে তোলার পর হিসাবের খাতায় ধরা পড়ছে ভিন্ন চিত্র। উৎপাদন ভালো হলেও লাভের অঙ্ক মিলছে না। এমন পরিস্থিতিতে অনেক কৃষকের কাছে ধান নয়, খড়ই হয়ে উঠছে শেষ ভরসা। উপজেলার কৃষক রফিকুল ইসলাম জানান, এক বিঘা জমিতে ধান চাষ করতে ২০ থেকে ২৩ হাজার টাকা খরচ হয়। জমি বর্গা নিলে সেই খরচ বেড়ে ২৫ থেকে ২৭ হাজার টাকায় দাঁড়ায়। জমি প্রস্তুত, বীজতলা, চারা রোপণ, সার, কীটনাশক, সেচ, শ্রমিক মজুরি, ধান কাটা, মাড়াই ও পরিবহন—সব ক্ষেত্রেই ব্যয় বেড়েছে। তিনি বলেন, ‘আগে যে কাজ ৪০০-৫০০ টাকায় হতো, এখন ৮০০-১০০০ টাকা লাগে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ১১০০-১২০০ টাকাও দিতে হয়েছে। ধান ভালো হলেও লাভ থাকে না। খরচ বেশি, কিন্তু ধানের দাম বাড়ে না। শেষে খড়টাই কিছুটা ভরসা।’ বোরো চাষি মুনসুর জানান, ধান কাটা ও মাড়াই প্রায় শেষ। তবে সম্প্রতি ঝড়-বৃষ্টির কারণে কাটা ধান ও শুকনো খড় ভিজে গেছে। ফলে শুকনো খড়ের ভালো দাম পাওয়া যাচ্ছে না। তিনি বলেন, ‘এবার বিলে ধানের ফলন ভালো হয়েছে। কিন্তু শ্রমিক সংকটের কারণে কাটা, মাড়াই ও পরিবহনে খরচ বেড়েছে। আবার ধানের বাজারদরও কম। বিঘাপ্রতি অন্তত ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা লোকসান হবে। তবে খড়ের দাম কিছুটা ভালো থাকায় ক্ষতি কিছুটা পুষিয়ে নেওয়া যাচ্ছে।’ তিনি আরও জানান, এক বিঘা জমিতে প্রায় এক কাউন খড় পাওয়া যায়। আগে প্রতি কাউন শুকনো খড় ৫ হাজার ৫০০ থেকে ৬ হাজার টাকায় বিক্রি হলেও বর্তমানে ভেজা খড় ৩ হাজার টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে। কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে স্থানীয় বাজারে প্রতি মণ ধান বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ১০০ টাকায়। অথচ কৃষকদের হিসাবে প্রতি মণ ধানের উৎপাদন খরচ দাঁড়াচ্ছে প্রায় ১ হাজার ২২০ টাকা। ফলে বাজারদর উৎপাদন খরচের নিচে থাকায় কৃষকদের হাতে তেমন লাভ থাকছে না। কৃষকরা জানান, ধান শুধু বিক্রির পণ্য নয়, এটি সারা বছরের খাদ্য নিরাপত্তারও অংশ। তাই লোকসান জেনেও তারা ধান চাষ চালিয়ে যাচ্ছেন। উপজেলার কৃষক আল মামুন বলেন, ‘এক বিঘা জমিতে ২১ মণ ধান পেয়েছি। সংসারের খরচ ও দেনা শোধ করতে ১২ মণ ধান ১ হাজার ১০০ টাকা দরে বিক্রি করেছি। লাভ বলতে কিছুই নেই। তবে বাড়িতে দুইটা গরু আছে, তাই খড়টাই এখন লাভ।’ কৃষকদের মতে, খড় এখন আলাদা অর্থনৈতিক গুরুত্ব পেয়েছে। গবাদিপশুর খাদ্য হিসেবে ব্যবহার ছাড়াও খড় বিক্রি করে কিছু টাকা আয় করা যায়। তবে তা মূল ফসলের লোকসান পূরণ করার মতো নয়। কৃষক সাইদুর রহমান বলেন, ‘ধানের মাঠ দেখে সবাই ভাবে কৃষক লাভে আছে। কিন্তু খরচের হিসাব কেউ দেখে না। মাঠে ফসল আছে, কিন্তু কৃষকের হাতে টাকা নেই।’ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, রাজশাহী অঞ্চলের রাজশাহী, নওগাঁ, নাটোর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় চলতি মৌসুমে মোট ৩ লাখ ৬৫ হাজার ৭৭৫ হেক্টর জমিতে ধান আবাদ হয়েছে। উৎপাদনে বড় ঘাটতি না থাকলেও কৃষকের আর্থিক সংকট বাড়ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। কৃষকদের ভাষায়, সোনালি ধানের প্রাচুর্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে ঋণ, অনিশ্চয়তা আর টিকে থাকার সংগ্রাম। তাই এখন অনেকের মুখে একই কথা ধান নয়, খড়ই এখন ভরসা।







