আনু মোস্তফা, রাজশাহী:ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে উত্তরাঞ্চলের রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের ছয়টি আসনে এনসিপির ৬ প্রার্থী ভোটের মাঠে রয়েছেন। এর মধ্যে রাজশাহী বিভাগের দুটি ও রংপুর বিভাগের চারটি আসনে এনসিপির প্রার্থীরা মাঠে আছেন।
তবে রংপুর বিভাগের দুটি আসন জামায়াত তাদের শরিক দল এনসিপিকে ছেড়ে দিলেও বাকি চারটি আসন থেকে এখনো প্রার্থী তুলে নেয়নি জোট শরিক জামায়াত। ফলে এসব আসনে তরুণদের নতুন দল জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপিকে অস্তিত্বের জন্য লড়াই করতে হচ্ছে।
এ ছয়টি আসন তারা জামায়াতের কাছ থেকে পুরোপুরি পাবেন কিনা- তা নিয়ে এনসিপির নেতারাও এ বিষয়ে স্পষ্ট কোনো বার্তা দিতে পারেননি।
জানা গেছে, তফশিল ঘোষণার পর সারা দেশের সঙ্গে রাজশাহী বিভাগে ৭টি জেলার ১৬টি আসনে দলীয় প্রার্থী মনোনয়ন দিয়েছিল জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপি। তাদের অনেকেই মনোনয়ন ফরম উত্তোলন করেছিলেন; কিন্তু এরই মধ্যে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোটবদ্ধ হওয়ায় রাজশাহী বিভাগের ৩৯টি সংসদীয় আসনের একটিও পায়নি তরুণদের নতুন দলটি। তবে জামায়াতের সঙ্গে জোটবদ্ধ হওয়ার পরও রাজশাহী বিভাগের দুটি আসনে নির্বাচন করছেন এনসিপির দুজন প্রার্থী। যদিও এসব আসনে জোট দল জামায়াত তাদের দলীয় প্রার্থী প্রত্যাহার করেননি।
অন্যদিকে রংপুর বিভাগের ৩৩টি আসনের মধ্যে চারটি আসনে এনসিপির প্রার্থীরা নির্বাচনে লড়ছেন। এসব আসনের মধ্যে দুটি ছেড়ে দিলেও বাকি দুটিতে জামায়াতের প্রার্থীরা মাঠে আছেন। ফলে দেশের উত্তরাঞ্চলের ৭২ আসনের মাত্র ছয়টিতে এনসিপির প্রার্থীরা নির্বাচনে থাকছেন বলে দলটির দুই বিভাগের বিভাগীয় সমন্বয়কগণ নিশ্চিত করেছেন।
সংশ্লিষ্ট দলীয় সূত্রে জানা গেছে, গত ১০ ডিসেম্বর কেন্দ্রীয় নেতারা সারা দেশের ১২৫ প্রার্থীর সঙ্গে রাজশাহী বিভাগের ৭টি জেলার ১৬টি আসনেও দলীয় প্রার্থী ঘোষণা করেন এনসিপি। প্রাথমিক প্রার্থী তালিকায় রাজশাহীর ৬টি আসনে কোনো প্রার্থী ঘোষণা করা হয়নি।
ঘোষণাকৃত আসনগুলির মধ্যে ছিল- জয়পুরহাটের দুটি আসন, পাবনা, বগুড়া ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের একটি করে, নওগাঁর পাঁচটি, নাটোরের দুইটি এবং সিরাজগঞ্জে চারটি আসনে প্রার্থী দিয়েছিল এনসিপি। এনসিপির প্রাথমিক প্রার্থী তালিকায় ছিলেন জয়পুরহাট-১ আসনে গোলাম কিবরিয়া ও জয়পুরহাট-২ আসনে আবদুল ওয়াহাব দেওয়ান কাজল, বগুড়া-৬ আসনে আব্দুল্লাহ-আল-বাকি, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ আসনে মু. নাজমুল হুদা রুবেল খান, নওগাঁ-১ আসনে কৈলাশ চন্দ্র রবিদাস, নওগাঁ-২ আসনে মো. মাহফুজার রহমান চৌধুরী, নওগাঁ-৩ আসনে পরিমল চন্দ্র উঁরাও, নওগাঁ-৪ আসনে মো. আবদুল হামিদ, নওগাঁ-৫ আসনে মনিরা শারমিন।
অপরদিকে, নাটোর-২ আসনে আব্দুল মান্নাফ, নাটোর-৩ আসনে অধ্যাপক এসএম জার্জিস কাদির, সিরাজগঞ্জ-৩ আসনে দিলশানা পারুল, সিরাজগঞ্জ-৪ আসনে দ্যুতি অরণ্য চৌধুরী, সিরাজগঞ্জ-৫ আসনে মনজুর কাদের, সিরাজগঞ্জ-৬ আসনে এসএম সাইফ মোস্তাফিজ, পাবনা-৪ আসনে অধ্যক্ষ ড. মো. আব্দুল মজিদকে প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করে দলটি।
বিভাগের এসব এনসিপি প্রার্থী নিজ নিজ আসন থেকে মনোনয়ন ফরম উত্তোলন করেছিলেন। তবে জামায়াতের সঙ্গে জোট হওয়ার পর নওগাঁ-৫ (সদর) আসনে এনসিপির প্রার্থী মনিরা শারমিন ঘোষণা দিয়ে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। জেলার বাকি প্রার্থীরা কেউ আর ভোটের মাঠে নেই।
এদিকে দলীয় সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে রাজশাহীর বিভাগের নাটোর ও সিরাজগঞ্জ জেলার একটি করে আসনে এনসিপির দুইজন প্রার্থী এখনো মাঠে সক্রিয় আছেন। তাদের অন্যতম নাটোর-৩ (সিংড়া) আসনের এনসিপির প্রার্থী হয়েছেন জেলা এনসিপির সদস্য সচিব অধ্যাপক জার্জিস কাদির। শনিবার বাছাইকালে তার মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষিত হয়েছে। প্রার্থী বৈধ ঘোষণা হওয়ার পর তিনি এলাকায় গণসংযোগ ও প্রচার প্রচারণা চালাচ্ছেন। কিন্তু এনসিপির এই হেভিওয়েট প্রার্থীর বিপরীতে জোটদল জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী অধ্যাপক সাইদুর রহমান প্রচার-প্রচারণাসহ ভোটের মাঠে সক্রিয় আছেন।
নাটোর-৩ আসনটি জোটের অংশীদার এনসিপিকে ছেড়ে দেওয়া হবে কিনা- জানতে চাইলে নাটোর জেলা জামায়াতের আমির ড. নুরুল ইসলাম বলেন, জামায়াতের জন্য নাটোর-২ আসনটি অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। জামায়াতের প্রার্থীর ইমেজ খুব ভালো ও স্থানীয়দের কাছে তিনি অত্যন্ত গ্রহণযোগ্য একজন ব্যক্তিত্ব।
তিনি আরও বলেন, যতটুকু জেনেছি নাটোর-২ আসনটি ছেড়ে দেওয়ার জন্য এনসিপি ও চরমোনাইভিত্তিক ইসলামী আন্দোলনের পক্ষ থেকে জামায়াতের কেন্দ্রীয় দায়িত্বশীলদের কাছে অনুরোধ করা হয়েছে; কিন্তু জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব নাটোর-২ আসন থেকে নিজেদের প্রার্থী তুলে নিতে অনিচ্ছা প্রকাশ করেছেন। সেক্ষেত্রে আসনটি জোট শরিকদের কাউকে ছেড়ে দেওয়ার সম্ভাবনা খুব কম। এরপরও যদি কেন্দ্রে সমঝোতা হয়ে আসনটি জামায়াতকে ছেড়ে দিতেই হয় সেক্ষেত্রে আমরা প্রার্থী সরিয়ে নেব।
জানা গেছে, আলোচিত নাটোর-৩ আসনে ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী খলিলুর রহমান গণসংযোগ অব্যাহত রেখেছেন। এ বিষয়ে এনসিপির প্রার্থী অধ্যাপক জার্জিস কাদির আগেই জানিয়েছেন জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতা সম্ভব না হলে তিনি দলীয় নেতৃত্বের সঙ্গে আলাপ আলোচনার পর পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবেন। দল সরে দাঁড়াতে বললে তিনি দলের বৃহত্তর স্বার্থে সরে যাবেন নির্বাচন থেকে।
অন্যদিকে রাজশাহী বিভাগের সিরাজগঞ্জ-৬ (শাহজাদপুর) আসনে এনসিপির প্রার্থী এসএম সাইফ মুস্তাফিজের মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষিত হওয়ার পর তিনি ভোটের মাঠে সক্রিয় আছেন। একই আসনে জোট শরিক জামায়াতের প্রার্থী মিজানুর রহমানও ভোটের মাঠে প্রচার প্রচারণা অব্যাহত রেখেছেন।
রাজশাহী বিভাগের দুটি আসনে থাকা এনসিপির প্রার্থীদের জামায়াত ছেড়ে দেবে কিনা- জানতে চাইলে এনসিপির রাজশাহী বিভাগীয় সমন্বয়ক ইমরান ইমন জানান, এ বিষয়টি তিনি বলতে পারবেন না। আসন সমঝোতার বিষয়টি কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব দেখছেন। তবে তিনি নিশ্চিত করেন রাজশাহী বিভাগের ৩৯ আসনের মধ্যে ১৬টি আসনে প্রার্থী মনোনয়ন দিয়েছিল এনসিপি। এখন দুটি আসনে এনসিপির দুইজন প্রার্থী অবশিষ্ট আছেন।
এদিকে উত্তরাঞ্চলের আরেক বিভাগ রংপুরের আট জেলায় এনসিপির চারজন প্রার্থী রয়েছেন। তাদের অন্যতম পঞ্চগড়-১ আসনে এনসিপির উত্তরাঞ্চল সমন্বয়ক সারজিস আলম ভোট করছেন। এনসিপির সারজিস আলমের কারণে এ আসনে মনোনীত প্রার্থী ইকবাল হোসাইনকে সরিয়ে নিয়েছে জামায়াত। অন্যদিকে রংপুর-৪ (পীরগাছা-কাউনিয়া) আসনে এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেনকে সমর্থন দিয়ে নিজেদের মনোনীত প্রার্থী এটিএম আজম খানকে তুলে নিয়েছে জামায়াত।
এ বিভাগের কুড়িগ্রাম-২ (রাজারহাট-ফুলবাড়ি-সদর) আসনটিতে প্রার্থী হয়েছেন এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক ড. আতিক মুজাহিদ। এ আসনে জামায়াতের ইয়াছিন আলী সরদার এবং আরেক জোট শরিক ইসলামী আন্দোলনের মাওলানা নুর বখত প্রার্থী হয়েছেন।
আসনটি জামায়াত এনসিপিকে ছেড়ে দিচ্ছে কিনা- জানতে চাইলে এনসিপির প্রার্থী আতিক মুজাহিদ বিষয়টি জানাতে পারেননি। তিনি গণসংযোগে রয়েছে এবং পরে কথা বলবেন জানিয়ে শেষ করেন।
এদিকে উত্তরের দিনাজপুর-৫ (পার্বতীপুর-ফুলবাড়ী) আসনেও এনসিপির প্রার্থী দলটির যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক ডা. আব্দুল আহাদ ভোটের মাঠে রয়েছেন। এই আসনেও জোট শরিক জামায়াতের প্রার্থী আনোয়ার হোসেন ভোটের মাঠে সক্রিয় আছেন।
জানা গেছে, এ আসনটি নিয়েও এনসিপির সঙ্গে জামায়াতের এখনো কোনো সমঝোতা হয়নি। এ বিষয়ে এনসিপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম আহ্বায়ক ও রংপুর বিভাগের সাংগঠনিক সম্পাদক আতিক মুজাহিদ বলেন, রংপুর বিভাগে এনসিপির চারজন প্রার্থী ভোট করছেন- এখন শুধু এটুকুই বলতে পারি।







