ডেস্ক নিউজ :-সে এক পিলে চমকানো দৃশ্য। কাঁধে লাশ নিয়ে হেঁটে যাচ্ছে এক ব্যক্তি।সাভারের পরিত্যক্ত পৌর কমিউনিটি সেন্টারে একের পর এক লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের রহস্য ভেদ করতে গিয়ে যখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী গলদঘর্ম, ঠিক তখনই সিসিটিভি ফুটেজে ধরা পড়ে এমন বিভীষিকাময় দৃশ্য। লাশ বহনকারী মানুষটি আর কেউ নন থানার সামনে নিয়মিত ঘোরাঘুরি করা পরিচিত এক ভবঘুরে। এর কিছুক্ষণ আগের দৃশ্যও কম ভয়ংকর নয়।একই ঘটনাস্থল। আগুনে পোড়া দুটি লাশ, যেগুলো থেকে তখনও ধোঁয়া বের হচ্ছে। চারপাশে দমবন্ধ করা উৎকট গন্ধ। মাত্র সাত মাসে একে একে পাঁচটি হত্যাকাণ্ড। প্রতিটি হত্যার ধরন অভিন্ন। হতবাক পুলিশ কর্মকর্তারা যখন রহস্যের জট খুলতে হিমশিম খাচ্ছেন, ঠিক তখনই নতুন করে উদ্ধার হয় আরও দুটি পোড়া লাশ।গত রবিবার বিকালে সর্বশেষ এই দুটি মরদেহ উদ্ধারের পর ঘটনাস্থলে ছুটে আসে পুলিশ, গোয়েন্দা পুলিশ, র্যাব, পিবিআই ও সিআইডির ক্রাইমসিন ইউনিট। আগের হত্যাকাণ্ডের সূত্র ধরে বসানো সিসিটিভি ফুটেজ এবং একজন অনুসন্ধানী সাংবাদিকের ধারণ করা ভিডিও এই দুইয়ের বিশ্লেষণেই বদলে যায় তদন্তের মোড়। ধীরে ধীরে উন্মোচিত হয় ছয়টি হত্যাকাণ্ডের রহস্য। শনাক্ত হয় খুনি। ধরা পড়ে ভবঘুরের ছদ্মবেশে থাকা সেই ব্যক্তি। ‘এরপর আর পুলিশকে খুব বেশি বেগ পেতে হয়নি’Ñ বলছিলেন সাভার মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আরমান আলি। জিজ্ঞাসাবাদে একে একে ছয়টি হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করেছে সে।পুলিশ জানায়, গ্রেপ্তার ওই ভবঘুরের নাম মশিউর রহমান খান সম্রাট। কখনও নিজেকে সাভারের ব্যাংক কলোনি, কখনও লালটেক এলাকার বাসিন্দা বলে পরিচয় দিত। অথচ তার প্রকৃত আস্তানা ছিল পরিত্যক্ত সেই পৌর কমিউনিটি সেন্টারই।এলাকাবাসীর ভাষ্য, সম্রাটকে সবাই ভবঘুরে হিসেবেই চিনত। কখনও রাস্তায়, কখনও কমিউনিটি সেন্টারের আশপাশে তাকে ঘোরাঘুরি করতে দেখা যেত। বিস্ময়ের বিষয়, সাভার মডেল থানা থেকে ওই কমিউনিটি সেন্টারের দূরত্ব মাত্র ১০০ গজ। কাছেই রয়েছে সাভার সরকারি কলেজ ও একটি সেনাক্যাম্প।ভবঘুরে বেশভূষা আর আচার আচরণের কারণে সাধারণ মানুষ তো বটেই, পুলিশের মনেও কোনো সন্দেহ জাগেনি। তাই একের পর এক হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে সে পরিকল্পিতভাবেই এগিয়ে যাচ্ছিল পরবর্তী নিশানার দিকে।গত রবিবার দুপুর ২টার দিকে কমিউনিটি সেন্টারের দ্বিতীয় তলা থেকে নতুন করে দুটি লাশ উদ্ধারের পরপরই পুলিশের তৎপরতা বাড়ে। এর আগে শুক্রবার সেখানে প্রবেশ করেছিলেন দৈনিক মানবজমিনের স্থানীয় প্রতিনিধি সোহেল রানা। তিনি সেখানে থাকা এক ভবঘুরে নারী ও তার সঙ্গে থাকা ছদ্মবেশী সম্রাটের ভিডিও ধারণ করেন।ওই ভিডিওতে নারীটি নিজের নাম সোনিয়া এবং বাড়ি শেরপুর বলে দাবি করেন। কথোপকথনে শোনা যায়, সম্রাট নারীটিকে চিনতে না পারলেও নারী তাকে ‘ভাই’ সম্বোধন করছিলেন। ঠিক দুই দিন পরই নির্মম পরিণতির শিকার হন ওই নারী।সাংবাদিক সোহেল রানার ধারণ করা ভিডিও এবং সিসিটিভি ফুটেজ এই দুই প্রমাণই তদন্তের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। পুলিশ নিশ্চিত হয়, ভিডিওতে থাকা নারীটি হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। অপর নিহত ব্যক্তির পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা চলছে।সিসিটিভি ফুটেজে সন্দেহভাজন ব্যক্তির চলাফেরা, সময় ও অবস্থান এবং সাংবাদিকের ভিডিওতে থাকা বক্তব্য বিশ্লেষণ করেই খুনিকে শনাক্ত করেন তদন্তকারীরা। তাৎক্ষণিক অভিযান চালিয়ে আটক করা হয় ভবঘুরের ছদ্মবেশে থাকা ওই ব্যক্তিকে।পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সে একই স্থানে রবিবারের দুটি হত্যাকাণ্ড ছাড়াও আগের তিনটিসহ মোট ছয়টি হত্যায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে।(ওসি) আরমান আলি জানান, ওই ব্যক্তিকে নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। সে নিঃসন্দেহে একজন সিরিয়াল কিলার। তার নিশানায় ছিল ভবঘুরে শ্রেণির মানুষ। তিনি বলেন, সিসিটিভি ফুটেজে আমরা দেখেছি, তার নিশানায় থাকা আরেক নারী ভবঘুরে স্থান পরিবর্তন করায় সে যাত্রায় প্রাণে বেঁচে গেছেন।এলাকাবাসী বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে পরিত্যক্ত সাভার পৌর কমিউনিটি সেন্টারটি হয়ে উঠেছিল আতঙ্কের আখড়া। প্রথম ঘটনা ঘটে প্রায় সাত মাস আগে সাভার মডেল মসজিদের সামনে এক নারীর মরদেহ উদ্ধারের মধ্য দিয়ে। এরপর গত বছরের ২৯ আগস্ট রাতে কমিউনিটি সেন্টার থেকে হাত-পা বাঁধা এক যুবকের মরদেহ, ১১ অক্টোবর রাতে এক অজ্ঞাত নারীর অর্ধনগ্ন মরদেহ এবং ১৯ ডিসেম্বর দ্বিতীয় তলার টয়লেট থেকে এক পুরুষের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। তবে এসব মরদেহের বেশিরভাগের পরিচয় এখনও শনাক্ত হয়নি।এসব ঘটনার পর উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে কমিউনিটি সেন্টার ঘিরে বসানো হয় সিসিটিভি ক্যামেরা। সর্বশেষ রবিবার দুটি মরদেহ উদ্ধারের পর এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে চরম আতঙ্ক। অনেকের মুখেই শোনা যায়, এরপর টার্গেট কে?স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, প্রতিদিন যাকে রাস্তায় হাঁটাহাঁটি করতে দেখি, চুপচাপ বসে থাকতে দেখি, কখনও বিড়বিড় করে কথা বলতে শুনি সেই মানুষটা যে একের পর এক খুন করেছে, ভাবতেই গা শিউরে ওঠে।ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান জানান, ছয়টি হত্যাকাণ্ডের ধরন একই। নিহতরা সবাই ভবঘুরে শ্রেণির মানুষ। নিঃসন্দেহে সম্রাট একজন মানসিক বিকারগ্রস্ত বা সাইকোপ্যাথিক কিলার। কেন সে একের পর এক এমন নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে এর মোটিভ উদ্ঘাটন অত্যন্ত জরুরি। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সে ছয়টি হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে। ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি গ্রহণের জন্য তাকে আদালতে তোলা হবে, জানান তিনি।







